সে এক সময় ছিল বটে । তখনও মানুষ বগল কামাতে শেখেনি । হাগু মুছতে টিস্যু পেপার ওঠেনি তখনও । তখনও মেয়েদের পেট ব্যথা হলে কোনও কোম্পানির মার্কেট সূচক বাড়তো না । তখনও মিনারেল জল না খেলেও নিমাই ভট্টাচার্যের পেট খারাপ করতো না । এমনই এক সময়ে আমি প্রেমিক হয়েছিলাম । আমাদের দেখা হতো মাসে এক দুবার । সেটাও নেহাত চোখের দেখা । এই ধর সে মানে আমার ইয়ে, পুকুর থেকে স্নান সেরে উঠানে কাপড় মেলছে, কখনও বা মুদির দোকানের কোনে এক ঝলক চোখের দেখা । তারপর সেই সব এক ঝলকের দেখারা বুকের ভেতর ধোঁয়া ছাড়তো অনেকদিন, অনেকটা রাত । কোনও কোনও রাতে ঘুম আসছে না । উঠানের কোমরে নারিকেল পাতার ছায়া, আকাশে তখন ঠাকুমার নথের মতো নরম চাঁদ । আমরা বাইরে বেরিয়ে পড়তাম বুকে বুকে প্রেম নিয়ে, সেই তার মুখ নিয়ে । সেও হয়তো নতুন পাঁকড়ার তুলোর বালিশে মুখ গুঁজে কী সব ভেবে ভেবে জ্বলজ্বলে ।
এক একটি চিঠি আমরা বুকে চেপে ধরতাম । SMS এর মতো তখনও ডিলিট ছিল না আমাদের । আমরা চিঠির শরীরে আপন মানুষের স্পর্শ পেতাম । এক একটি চিঠিতে আমাদের চোখ ডুবে মরতো বহুবার। তখন তো চিঠিরাও পুরাতন হতো না । এখন যেমন মানুষই পুরাতন ।
গ্রামের মেলাতে আমাদের দেখা হতো । যদি একটুও হাত ছুঁয়েছি কখনও তো সারাদিন আমরা রাজা । সারাদিন আমরা নরম নদী । তখনও এতো শরীর শরীর আসেনি । তখন কেবল মন মন ।
সে এক সময় ছিল বটে । তখনও বৃদ্ধাশ্রম আসেনি । তখনও মানুষ ইজি চেয়ার ভাঙলে দুঃখ করতো । তখনও ফ্ল্যাট বাড়ি আসেনি । তখনও আমাদের মাথার উপর ছিল মস্ত আকাশ । আজ যেমন মানুষের মাথার উপর আরো দুজন মানুষের ঘর, তার উপরে আরো কিছু মানুষের ……
আমাদের ছাদে ছাদে মরমর করতো চালতা, কিম্বা কুলের চাটনি । আমরা এক গাঁয়ের মানুষ অন্য গাঁয়ের খবর জানতাম, সুখ জানতাম, ব্যথা জানতাম । তখনও মানুষ মরলে দূর থেকে RIP টাইপ করতে শিখিনি আমরা । তখনও মানুষের শেষ যাত্রাতে মানুষের ভীড় নামতো, টলটলে ব্যথা হতো । তখনও বাবা মা মারা গেলে বিদেশে থাকা ছেলের জন্য মৃত শরীর পচে উঠতো না । তখনও আমরা বাবা মা এর কাছেই থাকতাম, আলো হয়ে ।
তখনও মানুষ মানুষের মুখ চিনতো, হাসি চিনতো ।
তখনও মানুষ মানুষ চিনতো ।